তিনি ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনের অত্যন্ত জনপ্রিয় এক ব্যক্তিত্ব।তবে তিনি বিখ্যাত ছিলেন তাঁর শারীরিক শক্তির কারণে,শুধুমাত্র একটি ছোরা নিয়ে তিনি একাই একটি বাঘকে হত্যা করতে সক্ষম হন বলে তাঁর নাম রটে যায় "বাঘাযতীন"।
১৮৯৫ সালে এন্ট্রান্স পাস করে তিনি কলকাতা সেন্ট্রাল কলেজে(বর্তমানের ক্ষুদিরাম বোস সেন্ট্রাল কলেজ)ভর্তি হন।কলেজের পাশেই স্বামী বিবেকানন্দ বাস করতেন।বিবেকানন্দের সংস্পর্শে এসে যতীন দেশের স্বাধীনতার জন্য আধ্যাত্মিক বিকাশের কথা ভাবতে শুরু করেন।এসময়ে প্লেগরোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। বিবেকানন্দের আহ্বানে যতীন তাঁর বন্ধুদের দল নিয়ে এই রোগে আক্রান্তদের সেবায় নিয়োজিত হন।
বিবেকানন্দের পরামর্শে যতীন শরীরচর্চার জন্য অম্বু গুহের কুস্তির আখড়ায় যোগ দেন। সেখানে তাঁর সাথে সেসময়ের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের দেখা হয়।এদের একজন শচীন বন্দোপাধ্যায়ের সাথে পরিচয়ের সূত্রে তিনি শচীনের পিতা যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণের সাক্ষাৎ পান।যোগেন্দ্রনাথ তখনকার ইউরোপের মাৎসিনি,গারিবল্ডি প্রমুখ ইতালীয় বিপ্লবীদের জীবনের আলেখ্য রচনা করেছিলেন।
১৯০৩ সালে যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণের বাড়িতে শ্রী অরবিন্দেরসাথে পরিচিত হয়ে যতীন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জড়িত হন। সরকারী নথিপত্রে যতীন পরিচিত হন শ্রী অরবিন্দের দক্ষিণহস্ত হিসাবে।অরবিন্দ ঘোষের সংস্পর্শে এসে যতীন শরীর গঠন আখড়ায় গাছে চড়া,সাঁতার কাটা ও বন্দুক ছোঁড়ার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।যুগান্তর দলে কাজ করার সময় নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের(এম.এন.রায়) সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং অচিরেই একে-অপরের আস্থাভাজন হন।
১৯০৬ সাল থেকে স্যার ডেনিয়েল হ্যামিলটনের সহযোগিতায় যতীন একাধিক মেধাবী ছাত্রকে বৃত্তি দিয়ে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।শুরু হয় তারকনাথ দাসকে দিয়ে;পরপর তাঁর পিছু পিছু রওনা হন গুরনদিৎ কুমার,শ্রীশ সেন,অধর লস্কর,সত্যেন সেন,জিতেন লাহিড়ি,শৈলেন ঘোষ।এদের কাছে নির্দেশ ছিল,উচ্চশিক্ষার সংগে সংগে আধুনিক লড়াইয়ের কায়দা ও বিস্ফোরক প্রস্তুতের তালিম নিয়ে আসতে এবং বিদেশের সর্বত্র ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি করতে।
১৯০৮ সালে বারীণ ঘোষের প্রথম প্রচেষ্টা মারাত্মকভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলে সবাই যখন হাল ছেড়ে দিয়েছে, তখন গোপনে শ্রী অরবিন্দের ঘনিষ্ঠ দুই প্রধান বিপ্লবী কানে কানে রটিয়ে দিলেন,"ওরে,হতাশ হস্নে!যতীন মুখার্জি হাল ধরে আছে!"এই দু'জনের নাম অন্নদা কবিরাজ ও মুন্সেফ অবিনাশ চক্রবর্তী।বাস্তবিক সভা-সমিতি যখন বেআইনি,সারাদেশ যখন ধড়-পাকড়ের আতঙ্কে বিহ্বল,যতীন তখন স্যার ডেনিয়েলের কাছ থেকে জমি লীজ নিয়ে গোসাবা অঞ্চলে পত্তন করলেন "Young Bengal Zamindari Cooperative" পলাতক কর্মীদের গ্রাসাচ্ছাদনের সংগে তিনি সোদপুরের শশীভূষণ রায় চৌধুরী'র দৃষ্টান্ত অনুযায়ী শুরু করলেন স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য নৈশ বিদ্যালয়,ছোট ছোট কুটির শিল্পের প্রতিষ্ঠান,হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা।গ্রামাঞ্চলের সংগে বিপ্লবীদের এই প্রথম প্রত্যক্ষ পরিচয় অত্যন্ত সুফল আসলো।
একটিমাত্র অপরাধী সম্পাদনা,
২৭ জানুয়ারি,১৯১০ তারিখে যতীনকে গ্রেপ্তার করা হল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার অভিযোগে।শুরু হল হাওড়া ষড়যন্ত্র মামলা।দশম জাঠ বাহিনীকেই বিপ্লবীদের সংগে সহযোগিতার অপরাধে ভেঙ্গে দেওয়ার আগে প্রধান অফিসারদের ফাঁসিতে ঝোলানো হল।এক বছর ধরে এই মামলা চলতে দেখে নতুন বড়লাট হার্ডিঞ্জ অসহিষ্ণু হয়ে দাবি করলেন "একটিমাত্র অপরাধী"কে দণ্ড দিয়ে বাকি আসামীদেরকে রেহাই দেবার। "একটিমাত্র অপরাধী" হিসেবে যতীন কারাগারে বসেই খবর পেলেন যে অদূর ভবিষ্যতে জার্মানির সঙ্গে ইংল্যান্ডের লড়াই বাঁধবে।
কলকাতার পুরো
দায়িত্ব অতুলকৃষ্ণ ঘোষের হাতে অর্পণ করে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে যতীন উপস্থিত হলেন তাঁর
পৈতৃক ভিটা ঝিনাইদহে।১৯১৪ সালের নভেম্বর মাসে সানফ্রান্সিসকো থেকে প্রত্যাবর্তন করলেন 'গদর'-নেতা সত্যেন
সেন; সংগে এলেন বিষ্ণুগণেশ পিংলে, কর্তারসিং সরাংগা ও
বিরাট একদল 'গদর'-কর্মী। সত্যেন জানালেন যে,বার্লিনে বীরেন
চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত বিপ্লবীরা খোদ কাইজারের সংগে
চুক্তি সই করেছেন ভারতে অস্ত্রশস্ত্র ও অর্থ পৌঁছে দেবে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে
পাঠানো কয়েকটি জাহাজ;এর দায়িত্ব নিয়েছেন ওয়াশিংটনে জার্মান রাষ্ট্রদূত ব্যার্নস্টর্ফ ও
তাঁর মিলিটারী আতাশে ফন্পাপেন।কাইজারের সনদ নিয়ে একটি বিপ্লবী মিশন রওনা হচ্ছে কাবুলঅভিমুখে;পথে
তারা জার্মানীর হাতে বন্দী ব্রিটিশ সৈন্যবহরের ভারতীয় জওয়ানদের নিয়ে গড়ে তোলা
বাহিনী নিয়ে কাবুল থেকে কুচকাওয়াজ করে হাজির হবে দিল্লীতে, যোগ দেবে সশস্ত্র অভ্যুত্থানে।বার্মা সীমান্তেও সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত
থাকছে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দখল করে বিদ্রোহ ঘোষণা করবে বলে।দূরপ্রাচ্যে
বিভিন্ন জার্মান দূতাবাস ও কনস্যুলেট সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত।
যতীনের চিঠি নিয়ে
পিংলে ও কর্তারসিং গেলেন রাসবিহারী'র সংগে দেখা করতে।টেগার্টের রিপোর্টে দেখা
যায়,এই সময়ে সত্যেন সেনকে নিয়ে যতীন কলকাতার বিভিন্ন রেজিমেন্টের অফিসারদের
সংগে আলোচনায় ব্যস্ত।ভারতের এই যজ্ঞ-অনলে ইন্ধন দেবার জন্য সাজসাজ পড়ে গেল দূর
প্রাচ্যে আমেরিকায়,ইউরোপে,মধ্যপ্রাচ্যে।ভূপতি মজুমদার স্পষ্ট
লিখে গিয়েছেন যে,"আন্তর্জাতিক এই সহযোগিতার উদ্ভাবন করেন স্বয়ং যতীন
মুখার্জি"।ইতিহাসে একে অভিহিত করা হয় "ভারত-জার্মান
ষড়যন্ত্র" নামে।
জটিল এই পরিস্থিতিতে
যতীনের আর কলকাতা থাকা সমীচীন নয়, বিবেচনা করে তাঁর শিষ্য ও সহকারীরা খুঁজে পেলেন বালেশ্বর(বালাসোর)-এর
আশ্রয়।ওখানকার উপকূলেই জার্মান অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রধান জাহাজটি আসার কথা।তার
প্রতীক্ষায় যতীন ওখানে চার-পাঁচজন কর্মীকে নিয়ে আস্তানা গাড়লেন।যতীনকে
বালেশ্বরে নিরাপদ দেখে নরেন ভট্টাচার্য(এম.এন. রায়) রওনা হলেন বাটাভিয়া অভিমুখে,বীরেন
চট্টোপাধ্যায়ের নির্দেশমাফিক; সেখানে হেলফেরিষ্ ভ্রাতাদের
কাছে বিশদ অবগত হলেন জার্মান অস্ত্র নিয়ে জাহাজ আসার পাকা খবর।ইতিমধ্যে রাসবিহারী'র
প্রচেষ্টা যেমন উত্তরাঞ্চলে ভেস্তে যায় কৃপাল সিং নামে বিশ্বাসঘাতক
'গদর' কর্মীর জন্য,তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চেকোস্লোভাকিয়া থেকে
সমাগত বিপ্লবীরা ইন্দো-জার্মান সহযোগিতার সংবাদ ফাঁস করে দেয় মার্কিন ও ব্রিটিশ
সরকারের দপ্তরে-প্রতিদানে নিজেদের সংগ্রামের অনুকূল সহানুভূতি পাবার
প্রত্যাশায়।মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগের উদ্যোগে জার্মান সরকারের সঙ্গে জার্মান
বিভিন্ন দূতাবাসের পত্র ও তারবার্তা হস্তগত করে ব্যাপক এই আন্তর্জাতিক সংগঠনের মূল উপড়ে ফেলতে উদ্যত
হল সমবেত ব্রিটিশ ও মার্কিন সুরক্ষা বিভাগ।পেনাং'এর একটি সংবাদপত্রের কাটিং থেকে
যতীন খবর পেলেন যে,অস্ত্রশস্ত্রসমেত জাহাজ ধরা পড়ে গিয়েছে।
কলকাতা থেকে খবর
এল,একের পর এক বিপ্লবীদের কেন্দ্রগুলিতে তল্লাস চালাচ্ছে পুলিশ। বালেশ্বরের সন্ধান
পেতে দেরী নেই।৮ সেপ্টেম্বর সারাদিন কেটে গেল গভীর জঙ্গলে। সারারাত পায়ে হেঁটে ৯
সেপ্টেম্বর ভোরবেলা পৌঁছলেন বালেশ্বরের নদী বুড়ি বালামের উপকণ্ঠে। সাঁতার কেটে নদীর ওপারে গিয়ে যুদ্ধের
পক্ষে মোটামুটি উপযুক্ত শুকনো এক ডোবার মধ্যে আশ্রয় নিলেন। বিপরীতপক্ষে চার্লস
টেগার্ট, কমান্ডার রাদারফোর্ড,জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কিলভি অসংখ্য সশস্ত্র পুলিস ও
সামরিক বাহিনী নিয়ে হাজির হয়েছিল।পরীখার আড়ালে বাঘা যতীনের নেতৃত্বে মোট
পাঁচজন,হাতে মাউজার পিস্তল।যুদ্ধ শুরু হলে পুলিসের গুলিতে ঘটনাস্থলে শহীদ হলেন
চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী। এই যুদ্ধের এমন নজির ইতঃপূর্বে দেখেননি বলে মেনে নিয়েছেন
প্রত্যক্ষদর্শী ইংরেজ কুশীলবেরা। ৯ সেপ্টেম্বর ১৯১৫ সালে
সূর্যাস্তের সংগে অবসান হল এই যুদ্ধের।পরদিন বালেশ্বর সরকারি হাসপাতালে যতীন শেষ
নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।তখনো রক্তবমি হচ্ছে।হেসে বললেন,
"এত রক্ত ছিল শরীরে? ভাগ্যক্রমে, প্রতিটি বিন্দু অর্পণ করে গেলাম দেশমাতার চরণে।"
"এত রক্ত ছিল শরীরে? ভাগ্যক্রমে, প্রতিটি বিন্দু অর্পণ করে গেলাম দেশমাতার চরণে।"


No comments:
Post a Comment