২৩ তম জন্মদিন মেয়ের।কথা দিয়েছিল ফিরবে সেদিন তারপর সেলিব্রেশন। তবু
উৎকন্ঠায় বাবা, মা, দাদারা। ফিরবে তো?? ১৭ ঘন্টা ধরে কোনো খোঁজখবর নেই যে! তবে কথা
রেখেছিল বাবার প্রিয় 'লাডো', ফিরেছিল ঠিক জন্মদিনের দিনই,নিজের নামের মানে কে পুরোপুরিভাবে
সার্থক করে ।কফিনবন্দী মেয়ের সুন্দর মুখখানা দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন মা,বাবা।
নীরজা ভানোদ। Neerja সিনেমাটি হবার আগে পর্যন্ত এ নাম টি বোধহয় কারো পরিচিত ছিল না।
২৩ বছর বয়সে আমি আপনি কিভাবে জীবন কাটাই ভেবে দেখুন।কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা,বন্ধুদের
সাথে আড্ডা, কেউ কেউ চাকরির দরখাস্ত ভরে, সপ্তাহন্তে পার্টি তারপর বাড়ি ফিরে এসে ভাবি
কত্তটা স্ট্রাগেল করে বেঁচে আছি!! তবে কেউ কেউ এসবের উর্দ্ধে
বাঁচে,জীবনের মানে কে বুঝে বাঁচতে শেখে। তাদেরই একজনের আজ জন্মদিন বা বলতে পারেন নশ্বর
শরীরটা পুড়ে খাঁক হয়ে যাবার দিন টা।
১৯৬৩সাল,৭ই সেপ্টেম্বর চন্ডিগড়ে, হিন্দুস্তান টাইমস এর সাংবাদিক বাবা হরিশ ভানোদ এবং
মা রামা ভানোদ এর কোল আলো করে জন্মায় তৃতীয় সন্তান নীরজা।জন্মের পর সপরিবারে পাড়ি দেয়
মুম্বাই।ছোট থেকেই রাজেশ খান্নার ভক্ত নীরজা তার ছবিগুলি টাঙিয়ে রাখে ঘরের সর্বত্র।দাদাদেরও
চোখের মণি ছোট্ট নীরজা। প্রথমে Bombay Scottish School তারপর St Xavier's College থেকে স্নাতক পাস করার পর ঠিক করে ফেলে মডেলিং কে বাছবে তার পেশা হিসাবে।১৯৮৫ সালে,মাত্র ২২ বছর
বয়সে পারিবারিক দেখাশোনা করে বিয়ে হয় তাঁর।স্বামীর সাথে
দোঁহা পাড়ি দেন নীরজা।কিন্তু এরপরই মোড় ঘুরে যায় তাঁর জীবনের, পণের জন্য দিনের পর দিন
অত্যাচার,না খেতে দিয়ে বন্দী করে রাখা,মানসিক এবং শারীরিক হেনস্তা এই পর্যায়ে পৌছায়
যে তাকে বিয়ের দুমাসের মধ্যে পালিয়ে আসতে হয় বাড়িতে।ব্যস এখানেই শেষ হয়ে যাবার কথা
ছিল। কিন্ত নীরজা আর পাঁচটা মেয়ে মত নয়, সেভাবে বাঁচতেও শেখেনি।বাবার শেখানো অন্যায়ের
সাথে আপোষ না করার কথাগুলি আজীবন সঙ্গী হয়েছিল তাঁর।অ্যাপ্লাই করেন USA এর সবচেয়ে বড়
Airlines, Pan Am একজন ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট হিসাবে।অসাধারন ব্যক্তিত্ব আর সুন্দরতায়
মুগ্ধ হয়ে তাকে সিনিয়র ফ্লাইট অ্যাটেন্ডেন্ট বানানো হয়।
১৯৬৫,৫ ই সেপ্টেম্বর,মুম্বাই থেকে উড়ান দেয় ফ্লাইট Pam Am 73,৩৬০ জন যাত্রী আর ১৩ জন
ক্রিউ নিয়ে। পাকিস্তান, করাচিতে পৌছাতেই চার
বন্দুকধারী হাইজ্যাক করে প্লেন। বুদ্ধিমতী নীরজা বুঝতে পেরেই সরাসরি জানায় ক্যাপ্টেনকে,এবং
তারা দ্রুত ককপিট থেকে বাইরে বেরিয়ে গিয়ে খবর দেন পাকিস্তান এবং
ভারতের ATC-কে।
প্যালেস্তানীয় সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর মূল টার্গেট আমেরিকান নাগরিকরা,২ জন কে সরাসরি
হত্যা করবার পর তারা সবার পাসপোর্ট দেখতে চাওয়ার নীরজা ইশারায়
তা লুকিয়ে ফেলতে নির্দেশ দেয় অন্যান্যদের।শেষে অধৈয্য হয়ে তারা বিষ্ফোরন ঘটানো মাত্রই
দ্রুত Emergency Exit খুলে দিয়ে যাত্রীদের বাইরে বার করার দায়িত্ব নেয়
নীরজা।শেষরক্ষা হয়নি।সন্ত্রাসবাদীদের এলোপাথারি গুলির হাত থেকে ৩ টে শিশুকে বাঁচাতে
প্রান দেন নীরজা ভানোদ,যিনি চাইলেই সিনিয়রিটি দেখিয়ে সবার আগে
বাইরে আসতে পারতেন।তাঁর মৃতদেহ এসে পৌছায় ৭ তারিখ মানে তাঁর জন্মদিনের দিন।৩৫৪ জন যাত্রী
১২ জন ক্রিউ কে বাঁচিয়ে 'অমর' হয়ে ফেরেন নীরজা, ভারতের
একজন বীরাঙ্গনা। সেদিন তার বয়স হত মাত্র ২৩!
এই
মহান বলিদানকে সম্মান জানায় ভারত সরকার অশোক চক্র দিয়ে (১৯৮৭), পাকিস্তান
সরকার দেন তমগ ই পাকিস্তান সম্মান,আমেরিকান সরকার দেয় Flight Safety Foundation Heroism
award, US Attorney award, Special
Courage award, Bharat Gourav award দেন US
parliment, Civil Aviation Ministry award প্রদান করে ভারত সরকার, ব্রিটেন সরকার দেয়
Bharta Gourav award. আজ তাঁর insurance-এর টাকায় তার পরিবারের
তৈরী Neerja Pan Am Foundation প্রত্যেকবছর ২ জন অসামান্য নারীকে পুরষ্কৃত করে।ভারতের
এক অগ্নিকন্যা নীরজা ভানোদ এর জন্মদিনে আজ পুরো বিশ্ব তাঁকে চেনে 'Heroine of
Hijack' নামে।
"চিত্ত যেথা ভয়শূণ্য,উচ্চ যেথা শির,জ্ঞান যেথা মুক্ত,যেথা গৃহের
প্রাচীর...নিজ হস্তে নির্দয় আঘাত করি পিতঃ,ভারতেরে সেই স্বর্গে করো জাগরিত।"




No comments:
Post a Comment